
বাচ্চু এমপির শাসনে কোনঠাসা হয়ে পড়েছে উপজেলা বিএনপির দুর্দিনের ত্যাগী নেতাকর্মীরা। কর্মীদের অবমূল্যায়ন, চিহ্নিত অপরাধিদের নিয়ে নিজস্ব বাহিনী গঠন, স্থানীয় শিল্পপ্রতিষ্ঠানে চাঁদাবাজি, ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিতে অস্ত্রের মোহরা, প্রতিপক্ষ নেতাকর্মীদের বাড়ি-ঘরে হামলা-ভাঙচুর, মিথ্যা মামলায় হয়রানীর অভিযোগ উঠেছে, ময়মনসিংহ-১১, ভালুকা আসনের সাংসদ ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর বিরুদ্ধে। বিএনপির দুর্দিনের নেতাকর্মীদের মাঝে দেখা দিয়েছে ক্ষোভ। জুলাই চেতনা ও বিএনপির আদর্শচূত্য বাচ্চুর বিরুদ্ধে এসব অভিযোগে একবার বহিষ্কার হওয়ার দুই বছরের মাথায় ১৮ জুলাই আবার কারণ দর্শানেরার নোটিশ দিয়েছে কেন্দ্রীয় বিএনপি। ঝুট ব্যবসা নিয়ন্ত্রণ নিয়ে প্রতিপক্ষের উপর বাচ্চু গ্রুপের হামলা-মামলার ঘটনায় এর আগেও ইনকিলাবসহ একাধিক গণমাধ্যমে সংবাদ প্রকাশিত হয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে উঠে আসে ভালুকায় বাচ্চু এমপির শাসনের চিত্র। স্থানীয়রা জানান, কোটি কোটি টাকা বিনিয়োগকরে আতঙ্কিত হয়ে পড়েছে স্থানীয় শিল্পপতিরা। ঝুট ব্যবসা থেকে জবর দখল, চাঁদাবাজি ও ছিনতাই অতীতের সকল রেকর্ড ভঙ্গ করেছে ভালুকা। বাচ্চুর থাবা থেকে রেহাই পাচ্ছেনা দলীয় নেতাকর্মী থেকে ব্যবসায়ী ও সাধারণ মানুষও। বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব এড রুহুল কবির রিজভীর স্বাক্ষরিত নোটিশে উল্লেখ্য করেন, ৫ আগস্ট ২০২৪ পরবর্তী সময়ে দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিএনপি’র প্রাথমিক সদস্য পদসহ দলের সকল পর্যায়ের পদ থেকে বাচ্চুকে গত ১লা সেপ্টেম্বর ২০২৪ তারিখে বহিস্কার করা হয়েছিল। কৃত অপরাধের জন্য দুঃখ প্রকাশ করে আবেদন করার প্রেক্ষিতে দলীয় সিদ্ধান্ত মোতাবেক উক্ত বহিস্কারাদেশ প্রত্যাহার করে তার প্রাথমিক সদস্য পদ ফিরিয়ে দেয়া হয়। কিন্তু বাচ্চু ও তার ঘনিষ্ঠ লোকজন আবারও দলীয় শৃঙ্খলা ভঙ্গ করে নানা ধরণের অনৈতিক অপতৎপরতায় লিপ্ত থাকার অভিযোগ পাওয়া গেছে। এ ধরণের অনৈতিক কার্যকলাপের জন্য কেন তার বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে না, তার যথাযথ কারণ দর্শিয়ে আগামী ৪৮ ঘন্টার মধ্যে একটি লিখিত জবাব দলের কেন্দ্রীয় কার্যালয়ে জমা দেয়ার জন্য নির্দেশ প্রদান করেন। শোকজে স্পষ্টই উল্লেখ্য করা হয়েছে। দলীয় শৃঙ্খলা বিরোধী বিতর্কিত কর্মকান্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ এর আগেও তাকে বহিষ্কার করা হয়েছিল। এর আগে ২০১৪ সালের উপজেলা নির্বাচনে বিএনপির দলীয় প্রার্থী মোর্শেদ আলমের বিরুদ্ধে প্রকাশ্যে নির্বাচন করেন, ফখর উদ্দিন আহমেদ বাচ্চুর নির্দেশে তার গ্রুপের নেতাকর্মীরা।
সংশ্লিষ্টরা জানান, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনে এমপি নির্বাচিত হন বাচ্চু। অপরদিকে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেন, মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম।
মোর্শেদ আলম পেয়েছিলেন ৬৫ হাজার ৫৯১ ভোট। মুহাম্মদ মোর্শেদ আলম, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির সাবেক যুগ্ম আহবায়ক, ভালুকা উপজেলা বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম আহবায়ক ও ভারপ্রাপ্ত আহবায়ক। ত্রয়োদশ সংসদ নির্বাচনে পতিত প্রশাসনকে নগ্নভাবে ব্যবহার, ভোটারদের ভয়-ভীতি দেখানো, ভোট কেন্দ্র থেকে মোর্শেদ আলমের এজেন্টদেরকে বেরকরে দেওয়া ও প্রকাশ্যে ব্যালট পেপারে সিল দিতে ভোটারদেরকে বাদ্যকরার অভিযোগও রয়েছে বাচ্চুর বিরুদ্ধে। নির্ভরযোগ্য একাধিক সূত্র জানায়, এমপি নির্বচিত হওয়ার পর বাচ্চুর অনৈতিক কর্মকান্ড আরো ব্যাপক আকার ধারণ করেছে। এলাকায় এক ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন বাচ্চু।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর থেকেই বিএনপি নেতাকর্মীদের নিয়ন্ত্রণে থাকা ঝুট ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা-বাণিজ্য হাতিয়ে নিতে মরিয়া হয়ে উঠে বাচ্চু ও তার পোষ্য লোকজন।
স্থানীয়রা জানান, উপজেলার জামির দিয়া এলাকায় এসকিউ গ্রুপের কালার মাস্টার কারখানাটি মোর্শেদ আলমের পারিবারিক ও তার ক্রয়কৃত জমিতে গড়ে উঠে। প্রতিষ্ঠানের শুরু থেকে প্রায় ২২ বছর যাবত মোর্শেদ আলমের মালিকানাধিন প্রতিষ্ঠান এইচ.আর.কে.এম এন্টারপ্রাইজের নামে বৈধভাবে ওয়ার্ক ওর্ডার নিয়ে ওই কারখানার জমি কেন-বেচা, কনস্ট্রাকশন, সাপ্লাই ও জুটের ব্যবসা করে আসছে। সংসদ নির্বাচনের পর থেকে এমপি বাচ্চুর নির্দেশে তার পোষ্য লোকজন মোর্শেদের ব্যবসা-বাণিজ্য বাধা দিয়ে আসছে। এরই ধারাবাহিকতায় ১৬ মার্চ মোর্শেদ কারখানা থেকে ঝুট বেরকরতে গেলে বাচ্চুর নির্দেশে তার পোষ্য লোকজন বাধা প্রদান করেন। উল্টো ইব্রাহিম খলিলকে বাদী সাজিয়ে বাচ্চুর ক্ষমতার দাপটে মোর্শেদ আলমসহ ৫০ জন বিএনপির নেতাকর্মীকে আসামী করে ভালুকা মডেল থানায় একটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলা নং-২৭। স্থানীয় নারিশ ফ্যাক্টরীর ঝুট ব্যবসা নিয়ে বাচ্চুর পোষ্য খোকা মিয়া ও তার ছেলে তোফায়েল আহমেদ রানার মধ্যে বিরোধকে কেন্দ্রকরে পিতা-পুত্রের মধ্যে গুলাগুলির ঘটনায় ভালুকা মডেল থানায় দায়েরকৃত অপর একটি মামলায়ও বাচ্চুর নির্দেশে মোর্শেদ আলমকে আসামী করা হয়। বাচ্চুর নির্দেশে ষড়যন্ত্রমূলক ও পরিকল্পিত দুটি মামলায় মোর্শেদ আলমসহ তার অনুসারী প্রায় ৮০/৯০ জন নেতাকর্মীকে আসামী করা হয়।
মোর্শেদ আলম বলেন, মিথ্যা মামলা আসামী করে তার কর্মী সমর্থকদের হয়রাণী করা হচ্ছে। তিনি আরোও জানান, গত সংসদ নির্বাচনের পর থেকে স্থানীয় এমপি বাচ্চুর নির্দেশে তার পোষ্য লোকজন মোর্শেদের ব্যবসা-বাণিজ্যে বাধা দিয়ে আসছে। বাচ্চু এলাকায় ত্রাসের রাজত্ব কায়েম করেছেন। দলীয় নেতা কর্মী থেকে শুরু করে সাধারণ মানুষ আতঙ্কে দিন যাপন করছে।
বিএনপির সাবেক এমপি আমান উল্লাহ চৌধুরীর ভাতিজা সাইফ উল্লাহ চৌধুরী জানান, বিএনপির ত্যাগী নেতাকর্মীরা সকল কিছু সুযোগ সুবিধা থেকে বঞ্চিত।
ভালুকা পৌর বিএনপির যুগ্ম আহবায়ক আবুল কালাম আজাদ বলেন, ৪৪ বছর ধরে বিএনপির রাজনীতি করে আমরা এখন আ’লীগ আমলের চেয়ে খারাপ অবস্থায় দিন কাটাচ্ছি। বর্তমান এমপি বাচ্চু তার সমর্থিত ব্যক্তিদের অত্যাচারে আমরা অতিষ্ট। ভালুকা উপজেলা বিএনপি যুগ্ম আহবায়ক রুহুল আমীন বলেন, এমপি বাচ্চুর লোকজন বিএনপিকে দুইগ্রুপে বিভক্ত করে ফেলেছে। ৯০ সাল থেকে বিএনপির রাজনীতি করি। আমাকে ২টি মিথ্যা মামলার আসামী করা হয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা জানান, বাচ্চু এমপি নির্বাচিত হওয়ার পর খোকা মিয়া, ইব্রাহিম খলিল, বৈষম্যবিরোধী ছাত্রআন্দোলনে নিহত তোফাজ্জল হত্যা মামলার এজাহারভূক্ত আসামী যুবলীগ নেতা খলিলুর রহমান মাসুদ ও আ’লীগ নেতা মতিউর রহমান মতি মেম্বার ও মো. সোহাগ মিয়ার নেতৃত্বে একটি বাহিনী গড়ে তুলেছেন। বাচ্চুর প্রতিনিধি হিসেবে হবিরবাড়ী এলাকার মিলকারখানার ঝুট ব্যবসা ও চাঁদাবাজি এরাই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন।
সরেজমিনে জানাযায়, জামিরদিয়ায় অবস্থিত এনভয় টেক্সাইল মিলের মিলের ফটকের সামনে থেকে খালিড্রাম বহনকারী একটি ট্রাক ছিনতাই হয়। পরে শিল্পপুলিশের সহায়তায় ট্রাকটি উদ্ধারও হয়। এই ঘটনায় মিল কর্তৃপক্ষের পক্ষ থেকে শিল্পপুলিশ, ময়মনসিংহ-৫, এর পুলিশ সুপার বরাবর মিলের ডিজিএম মো. সারোয়ার হোসেন একটি লিখিত অভিযোগ দেন। অভিযোগে উল্লেখ্য করেন, ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা স্বেচ্ছাসেবক দলের সাবেক সহসাংগঠনিক সম্পাদক মো. ইব্রাহিম খলিল এবং ইউনিয়ন স্বেচ্ছাসেবক দল নেতা মো. সোহাগ মিয়া ও তাদের সহযোগীরা সরাসরি ট্রাক ছিন্তাইয়ে জড়িত ছিলেন। ইব্রাহিম খলিল ও মো. সোহাগ মিয়া দুজনই বাচ্চু বাহিনীর সদস্য হিসেবে এলাকায় পরিচিত। অভিযোগে আরও দাবী করা হয়, ইব্রাহিম খলিল ও সোহাগ মিয়া ফ্যাক্টরি থেকে ঝুট বের না করার জন্য প্রকাশ্যে হুমকি দিচ্ছেন। প্রতিষ্ঠানের নতুন নির্মাণকাজে ব্যবহৃত বালু, খোয়া, স্টোন চিপসহ অন্যান্য সামগ্রী বহনকারী গাড়ি কারখানায় প্রবেশে বাধা দিচ্ছেন। এর ফলে এনভয় টেক্সটাইলসের নির্মাণকাজ বন্ধ হয়ে গেছে।
ময়মনসিংহ দক্ষিণ জেলা বিএনপির শীর্ষস্থানীয় এক নেতা নাম প্রকাশ না করার সর্তে জানান, ভালুকায় ৪ টি বিএনপিপন্থী মালিকদের ফ্যাকটরি থেকে এমপি বাচ্চু চাঁদাবাজি করেছে। পরে সেসব মালিকরা স্থানীয়ভাবে সুরাহা না পেয়ে প্রধানমন্ত্রীকে জানানোর উদ্যোগ নিয়েছে। এসব বিষয়ে স্থানীয় বিএনপির অনেক ত্যাগী নেতাকর্মীরাও এখন লজ্জায় নিজেদের আড়াল করে রাখেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে বিএনপির একাধিক নেতা বলেন, এমপি বাচ্চুর কর্মকান্ডে একদিকে সাধারণ ব্যবসায়ী ও স্থানীয় বাসিন্দাদের মধ্যে চরম ক্ষোভ ও আতঙ্ক সৃষ্টি হয়েছে। অপরদিকে বিএনপি ও সরকারের ভাবমুর্তি চরমভাবে ক্ষুন্ন হয়েছে।
তারা বিশ্বাস করেন, বিএনপির চেয়ারম্যান ও সরকার প্রধান বিষয়টি আমলে নিবেন।
এসব অভিযোগ অস্বীকার করে এমপি বাচ্চু গণমাধ্যমকে বলেন, তিনি বা তার পরিবারের কোনো সদস্য ঝুট ব্যবসার সঙ্গে জড়িত নয়। বিএনপি নেতা মোর্শেদ আলম ও নেতাকর্মীদের বিরুদ্ধে মামলা প্রসঙ্গে এমপি বাচ্চু দাবি করেন, ওই মামলাগুলোতে তাঁর কোনো ইন্ধন নেই। এটি সম্পূর্ণ ব্যক্তিগত রেষারেষি। এনভয় টেক্সটাইলসের ট্রাক ছিনতাই প্রসঙ্গে এমপি বাচ্চু জানান, ঘটনার সময় তিনি সংসদে ছিলেন। খবর পেয়ে তিনি স্থানীয় বাসিন্দাদের সহযোগিতায় ১ ঘণ্টার মধ্যে ট্রাকটি উদ্ধারের ব্যবস্থা করেন। চব্বিশের ৫ আগস্ট -পরবর্তী সময়ে তাঁর বিরুদ্ধে যে মামলা হয়েছিল, তা ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন। বাচ্চু বলেন, কোন কারখানার মালিক এখনো আমার বিরুদ্ধে কোন অভিযোগ করেনি। বিএনপির কেন্দ্রীয় যুগ্ম মহাসচিব সৈয়দ এমরান সালেহ প্রিন্স গণমাধ্যম কে বলেন, প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান যে কোনো অপরাধের বিরুদ্ধে সম্পূর্ণ ‘জিরো টলারেন্স’ নীতি অবলম্বন করছেন। দলের ভেতরে বা বাইরে যাদের বিরুদ্ধেই অভিযোগ উঠবে, তাদের বিরুদ্ধে তদন্তসাপেক্ষে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।