
বাংলাদেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী ধর্ষণ একটি চরম এবং সম্পূর্ণ অ-আপোষযোগ্য ফৌজদারি অপরাধ। নারী ও শিশু নির্যাতন দমন আইন অনুযায়ী এই ধরনের জঘন্য অপরাধের ক্ষেত্রে কোনো ধরনের সামাজিক মীমাংসা বা ‘সালিশ’ করার বিন্দুমাত্র আইনি সুযোগ নেই। কিন্তু দেশের সেই আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখিয়ে ময়মনসিংহে ১১ বছরের এক বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন (মানসিকভাবে অসুস্থ) শিশুকে ধর্ষণের ঘটনা ধামাচাপা দিতে বসেছিল মধ্যরাতের এক অবৈধ সালিশি বৈঠক। সেখানে অবুঝ এক শিশুর ওপর হওয়া পাশবিকতার মূল্য নির্ধারণ করা হয়েছে মাত্র ৫০ হাজার টাকা। আগামী সোমবার (২২ জুন) এই অর্থ লেনদেনের মাধ্যমে ঘটনাটি চিরতরে চেপে যাওয়ার সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করেছে স্থানীয় একটি প্রভাবশালী চক্র। ময়মনসিংহ কোতোয়ালি থানাধীন চর নিলক্ষীয়া ইউনিয়নের একটি প্রত্যন্ত গ্রামে ঘটে যাওয়া এই ঘটনাটি এখন স্থানীয়ভাবে প্রকাশ্য আলোচনায় পরিণত হলেও, প্রভাবশালী মহলের ভয়ে চরম নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছে ভুক্তভোগী পরিবারটি। মাঠ পর্যায়ের সরেজমিন অনুসন্ধানে উঠে এসেছে এই ভয়াবহ ও বেআইনি অপতৎপরতার চিত্র।
সুপারি কুড়াতে গিয়ে মহাবিপত্তি, অতঃপর মধ্যরাতে গোপন সালিশ!
অনুসন্ধানে জানা যায়,গত ১৫ জুন আনুমানিক দুপুর ২:৩০ মিনিটের দিকে চর নিলক্ষীয়া ইউনিয়নের ৬নং ওয়ার্ডের একটি গ্রামে এই লোমহর্ষক ঘটনা ঘটে। ভুক্তভোগী ১১ বছরের শিশুটি জন্মগতভাবেই মানসিকভাবে অসুস্থ এবং ছোটবেলা থেকেই সে একই গ্রামে তার নানার বাড়িতে বড় হচ্ছে। ঘটনার দিন দুপুরে বাড়ির পাশে সুপারি কুড়াতে গেলে প্রতিবেশী আইজুল মুন্সি (৭০) নামের এক বৃদ্ধের মাধ্যমে সে চরম পাশবিক নির্যাতনের শিকার হয় বলে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ ওঠে। ঘটনাটি জানাজানি হওয়ার পর এলাকায় তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হলেও আইনি প্রক্রিয়া এড়াতে তাৎক্ষণিক তৎপর হয়ে ওঠে স্থানীয় কয়েকজন প্রভাবশালী মাতব্বর। ঘটনাটি যাতে পুলিশ বা প্রশাসন পর্যন্ত না পৌঁছায়, সেজন্য আইনের তোয়াক্কা না করে ঘটনার দিন অর্থাৎ ১৫ জুন দিবাগত রাত ১২টার দিকে ভুক্তভোগীর নানার বাড়িতেই এক গোপন সালিশ বৈঠক বসানো হয়।
কথিত সালিশের সিদ্ধান্ত ও আর্থিক রফাদফার চালচিত্র: আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ধর্ষণের মতো অপরাধের মীমাংসা করতে বসা সেই অবৈধ সালিশের নেপথ্যে যারা রয়েছেন: মূল নেতৃত্ব: কথিত এই সালিশের মূল নেতৃত্ব দেন স্থানীয় মাতব্বর সাইদুল ও সুমনসহ তাদের কয়েকজন সহযোগী। অবৈধ সিদ্ধান্ত: দীর্ঘ আলোচনার পর ৭০ বছর বয়সী অভিযুক্ত ধর্ষক আইজুল মুন্সিকে ‘আইনি ঝামেলা’ থেকে বাঁচাতে মাত্র ৫০ হাজার টাকা জরিমানা ধার্য করা হয়। বাস্তবায়ন প্রক্রিয়া: সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, আগামী সোমবার (২২ জুন) প্রতিবেশী সুমন (৩০) ও মানিক (৪৫)-এর মাধ্যমে এই টাকা ভুক্তভোগী পরিবারের হাতে তুলে দেওয়া হবে। এরপর এই বিষয়ে আর কেউ কোনো ধরনের মুখ খুলতে পারবে না বলে গ্রামীণ সালিশদাররা মৌখিক নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
চিকিৎসাহীনতায় ভুক্তভোগী শিশু, নজরদারিতে পরিবার! ধর্ষণের মতো একটি মারাত্মক ও স্পর্শকাতর ঘটনার ৫ দিন পার হয়ে গেলেও (আজ শনিবার) অবহেলা, অসচেতনতা এবং লোকলজ্জার ভয়ে শিশুটির কোনো ডাক্তারি পরীক্ষা (Medical/Forensic Test) করানো হয়নি। শারীরিক ও মানসিকভাবে বিপর্যস্ত শিশুটির জন্য কোনো যথাযথ চিকিৎসার ব্যবস্থাও করেনি পরিবারটি। সরেজমিনে ভুক্তভোগী পরিবারের সাথে কথা বলতে গেলে সেখানে এক প্রচ্ছন্ন ভীতির পরিবেশ লক্ষ্য করা যায়। পরিবারটি সামাজিকভাবে এতটাই অসচেতন এবং স্থানীয় প্রভাবশালীদের চাপের মুখে রয়েছে যে,তারা প্রকাশ্যে কোনো হুমকির কথা স্বীকার করতেও ভয় পাচ্ছে। তবে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক প্রতিবেশী জানান, সালিশের পর থেকেই পরিবারটিকে এক প্রকার কড়া নজরদারিতে রাখা হয়েছে যেন তারা কোনোভাবেই পুলিশ বা গণমাধ্যমকর্মীদের সাথে যোগাযোগ করতে না পারে। অভিযুক্ত পলাতক, স্বজনদের মুখে সত্যতার স্বীকারোক্তি: ঘটনার পর থেকেই অভিযুক্ত বৃদ্ধ আইজুল মুন্সি এলাকা ছেড়ে পলাতক রয়েছেন এবং তার মুঠোফোনটি বন্ধ পাওয়া যাচ্ছে। অনুসন্ধানের স্বার্থে তার বাড়িতে গিয়ে কাউকে পাওয়া যায়নি, পরিবারের অন্য সদস্যরাও বিষয়টি নিয়ে ‘গা ঢাকা’ দিয়েছেন। তবে অনুসন্ধানের এক পর্যায়ে অভিযুক্তের ভাতিজা মাইজুল ইসলাম ঘটনার সত্যতা স্বীকার করে জানান, এলাকায় বিষয়টি নিয়ে একটি সালিশ হয়েছে এবং সেখানে টাকার বিনিময়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা চলছে। ধর্ষণের মতো জঘন্য অপরাধ ধামাচাপা দিতে সালিশের আয়োজন এবং পাঁচ দিন ধরে পুলিশ প্রশাসনের বিষয়টি জানতে না পারা নিয়ে স্থানীয় সচেতন মহলে তীব্র ক্ষোভ ও নানা প্রশ্ন উঠেছে। তদন্তপূর্বক কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে: জেলা পুলিশ সুপার। এই বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপারের সাথে মুঠোফোনে যোগাযোগ করা হলে,মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধানী তথ্য ও অবৈধ সালিশের বিষয়টি জানার পর ময়মনসিংহ জেলা পুলিশ সুপার মোহাম্মদ কামরুল হাসান তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় এই প্রতিবেদককে জানান: "বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বের সাথে দেখা হচ্ছে। এই ধরনের জঘন্য অপরাধে কোনো ধরনের আপোষ বা সালিশ করার আইনি সুযোগ নেই। যারা ধর্ষণের মতো ঘটনা সালিশের মাধ্যমে মীমাংসার চেষ্টা করেছে, তারাও আইনের চোখে সমান অপরাধী। দ্রুততম সময়ের মধ্যে ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তপূর্বক মূল অভিযুক্ত এবং অবৈধ সালিশকারীদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" সচেতন মহলের দাবি: অপরাধী ও সালিশকারীদের অবিলম্বে গ্রেপ্তার করা হোক-
স্থানীয় সচেতন মহল ও মানবাধিকার কর্মীরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলছেন, আইন নিজের হাতে তুলে নিয়ে ধর্ষণের মতো ফৌজদারি অপরাধ ধামাচাপা দেওয়ার চেষ্টা করা সালিশকারীরা আইনের চরম লঙ্ঘন করেছেন। অপরাধীকে বাঁচানোর এই অপচেষ্টা বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে উসকে দেয়। আগামী সোমবার টাকার যে অবৈধ লেনদেনের প্রস্তুতি চলছে, তার আগেই মূল অভিযুক্ত আইজুল মুন্সির পাশাপাশি সালিশের মূল হোতা সাইদুল, সুমন ও মানিককে দ্রুত তদন্তপূর্বক আইনের আওতায় এনে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি নিশ্চিত করা এখন সময়ের দাবি। তা না হলে দেশের আইনের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা চরমভাবে ক্ষুণ্ন হবে।