
বাংলাদেশের গণপরিবহন, বিশেষ করে ট্রেন ও বাস এখন আর সাধারণ যাত্রী, এমনকি শিক্ষার্থীদের জন্য নিরাপদ নয়। শিক্ষা ও গন্তব্যে যাতায়াতের প্রধান এই মাধ্যমগুলোতে প্রতিনিয়ত ঘটছে ছিনতাই ও চুরির ঘটনা। সর্বশেষ গত ৬ জুলাই, সোমবার দুপুরে ময়মনসিংহ সদর এলাকা অতিক্রমকালে 'বলাকা কমিউটার' ট্রেনে এক স্কুল শিক্ষার্থীর ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনা জনমনে তীব্র আতঙ্ক ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে। ঘটনার বিবরণ: ভুক্তভোগী নবম শ্রেণির ওই শিক্ষার্থী তার মায়ের সাথে জারিয়া থেকে ময়মনসিংহ শহরে আসছিল। দুপুর আনুমানিক ১টা ৪০ মিনিটের দিকে ট্রেনটি যখন ময়মনসিংহ সদরের বলাশ এলাকা অতিক্রম করছিল, তখন ধীরগতির সুযোগ নিয়ে সাদা গেঞ্জি পরিহিত এক দুষ্কৃতকারী ট্রেনের ভেতরে ঢুকে মুহূর্তের মধ্যে শিক্ষার্থীর ব্যাগটি টান দিয়ে নিয়ে ট্রেন থেকে লাফিয়ে পালিয়ে যায়। ব্যাগটির ভেতরে শিক্ষার্থীর নবম শ্রেণির গুরুত্বপূর্ণ পাঠ্যবই, নগদ ২৩ হাজার ৪০০ টাকা এবং ব্যক্তিগত প্রয়োজনীয় নথিপত্র ছিল। চোখের সামনে ব্যাগ ছিনতাইয়ের ঘটনায় শিক্ষার্থী ও তার মা চরম আতঙ্কিত হয়ে পড়েন। ট্রেনটি চলমান থাকায় ছিনতাইকারীকে ধরা সম্ভব হয়নি। নিরাপত্তাহীনতার অন্তরালে বাস্তব চিত্র: একজন শিক্ষার্থীর হাত থেকে পাঠ্যবই ও অর্থ ছিনতাই হওয়ার ঘটনা কেবল একটি সাধারণ অপরাধ নয়, এটি নাগরিক নিরাপত্তা কাঠামোর দুর্বলতাকে নির্দেশ করে। সংশ্লিষ্টরা বলছেন:
নিয়মিত নজরদারির অভাব: ট্রেনের বগিগুলোতে পর্যাপ্ত নিরাপত্তা কর্মী বা টহলদলের অভাব থাকায় ছিনতাইকারীরা সহজেই অপরাধ করে পার পেয়ে যাচ্ছে। ঝুঁকিপূর্ণ এলাকা: ময়মনসিংহ শহরের উপকণ্ঠের কিছু এলাকা চিহ্নিত যেখানে ট্রেন ধীরগতিতে চলে। এসব স্থানকে অপরাধীরা তাদের নিরাপদ ক্ষেত্র হিসেবে বেছে নিয়েছে। শিক্ষার্থীদের উদ্বেগ: প্রতিদিন হাজারো শিক্ষার্থী জীবন ও শিক্ষা উপকরণের নিরাপত্তা নিয়ে ঝুঁকির মুখে যাতায়াত করছে, যা তাদের মানসিক ও শিক্ষাজীবনে বড় ধরনের নেতিবাচক প্রভাব ফেলছে। প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপের দাবি: ভুক্তভোগী পরিবারের পক্ষ থেকে কোতোয়ালি মডেল থানা ও রেলওয়ে থানায় আইনানুগ অভিযোগ দায়ের করা হয়েছে। তবে কেবল অভিযোগ দায়েরই যথেষ্ট নয়, স্থানীয় সচেতন মহল মনে করছেন, প্রশাসনের উচিত বিষয়টিকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়ে দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়া। মানবাধিকার কর্মী ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা বলছেন, "একটি স্কুল শিক্ষার্থীর ব্যাগ ছিনতাই হওয়া রাষ্ট্রের নিরাপত্তা ব্যবস্থার ব্যর্থতারই বহিঃপ্রকাশ। অপরাধীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনতে এবং উদ্ধার অভিযানে বিশেষায়িত বাহিনী গঠন করা সময়ের দাবি।" বিশেষজ্ঞের অভিমত: অপরাধ বিশ্লেষকদের মতে, "ট্রেনের রুটগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরার মনিটরিং এবং সাদা পোশাকে গোয়েন্দা নজরদারি বাড়ানো জরুরি। বিশেষ করে যেখানে ট্রেন ধীরগতিতে চলে, সেসব পয়েন্টে পুলিশি টহল জোরদার করলে ছিনতাই প্রবণতা অনেকাংশে কমে আসবে।" ঘটনার পর থেকে এলাকায় আতঙ্ক বিরাজ করছে। ভুক্তভোগী শিক্ষার্থীর পরিবার এবং সাধারণ যাত্রীদের একটাই দাবি—আর যেন কোনো শিক্ষার্থীর হাত থেকে বই ও স্বপ্ন ছিনতাই না হয়। প্রশাসন কি এবার টনক নড়বে? নাকি আরও বড় কোনো ট্র্যাজেডির অপেক্ষায় থাকতে হবে আমাদের? সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ, বিশেষ করে রেলওয়ে পুলিশ এবং জেলা প্রশাসন ও পুলিশ প্রশাসনের নিকট দ্রুত অপরাধী শনাক্তকরণ এবং হারানো মালামাল উদ্ধারসহ গণপরিবহনে কঠোর নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জোর দাবি জানিয়েছেন এলাকাবাসী।