ময়মনসিংহ সদর উপজেলা পরানগঞ্জ ইউনিয়নে ঘুরে এসে ২০ শয্যা বিশিষ্ট, হাসপাতালের প্রবেশ পথের ডান দিকের চুনকাম উঠে যাওয়া দেয়ালে গর্ভবতী সেবা, স্বাভাবিক প্রসব সেবাসহ হরেক রকমের সেবার কথা উল্লেখ থাকলেও ভেতরে প্রবেশ করতেই ভিমড়ি খেতে হবে। হাসপাতালের নামের পাশে ‘শয্যা’ শব্দটি জুড়ে দেওয়া হলেও বাস্তবে তার কোনো অস্তিত্বই নেই। এখানে শুধুমাত্র চালু রয়েছে বহির্বিভাগ চিকিৎসা কেন্দ্র (আউটডোর)। সেখানেও কখনো-সখনো জুটে না প্রাথমিক চিকিৎসাও। মাঝে মধ্যে চিকিৎসক ব্যবস্থাপত্র লিখে দিলেও প্যারাসিটামল ওষুধ ছাড়া অন্য কোনো ওষুধেরও বরাদ্দ নেই।
বন্ধ রয়েছে ইনডোর বিভাগও। নান্দনিক অবকাঠামো থাকলেও নেই প্রয়োজনীয় জনবল।
এ হাসপাতালের নাম পরানগঞ্জ ২০ শয্যা হাসপাতাল। চালু হওয়ার ১৮ বছরেও এ হাসপাতাল কোনো কাজেই আসছে না চরাঞ্চলের প্রায় ৫ লাখ বাসিন্দার। ন্যূনতম চিকিৎসা সেবাও না থাকায় তারা এ হাসপাতালের নামই যেন ভুলতে বসেছেন।
জানা যায়, ময়মনসিংহ সদর উপজেলার ব্রহ্মপুত্র নদের চরাঞ্চলের মানুষের চিকিৎসা সেবা দেয়ার লক্ষে ২০০৪ সালের ১৪ ডিসেম্বর পরানগঞ্জ ইউনিয়নে ২০ শয্যার এ হাসপাতালের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন সেই সময়ের ময়মনসিংহ-৪ (সদর) আসনের সংসদ সদস্য দেলোয়ার হোসেন খান দুলু। প্রায় ৪ কোটি টাকা ব্যয়ে এ হাসপাতালের নির্মাণ কাজ শেষ হয়। ২০০৬ সালের ১৭ অক্টোবর এ হাসপাতালের উদ্বোধন করা হয়। সার্বক্ষণিক চিকিৎসা সেবা দিতেই নির্মিত হয় চিকিৎসক-কর্মচারীদের জন্য কোয়ার্টার।
পরে ২০০৭ সালের ১৭ ফেব্রুয়ারি জরুরি সরকারের সময়ে কোনো জনবল নিয়োগ ছাড়াই শুরু হয় চিকিৎসা সেবা কার্যক্রম। চিকিৎসা সেবার জন্য এ হাসপাতালে ময়মনসিংহ সদর উপজেলা স্বাস্থ্য বিভাগ থেকে চিকিৎসক ও কর্মচারীদের পালাক্রমে ডেপুটেশনে যাওয়ার কথা থাকলেও চিকিৎসকের খুব একটা দেখা মেলে না।
এ হাসপাতালটি মুখ থুবড়ে পড়ায় চিকিৎসার জন্য প্রায় ২৫ কিলোমিটার পথ পাড়ি দিয়ে তাদেরকে আসতে হয় ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অথচ চরাঞ্চলের অষ্টধর, বোরোরচর, পরানগঞ্জের চর সিরতা, চর ঈশ্বরদিয়া ছাড়াও ফুলপুর ও তারাকান্দা উপজেলার গুটিকয়েক এলাকার স্বাস্থ্যসেবার জন্য প্রধান ভরসা হওয়ার কথা ছিল এ হাসপাতালই।
বছর দুয়েক আগে এখানে গর্ভবতী চিকিৎসা সেবা না পেয়ে ময়মনসিংহ মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেয়ার পথে মারা যান বেগম নামে এক নারী, এমন তথ্য জানান স্থানীয় পরানগঞ্জ ইউনিয়নের চর বওলা গ্রামের দেলোয়ার ও মো. মেরাজ উদ্দিন।
একই গ্রামের মিস্টার হোসেন, হযরত আলী (৮০), শামসুদ্দিন (৭০), মো. আলতাব আলী, ক্ষুদে ব্যবসায়ী ফজলুল অভিযোগ করে জানান, ‘এ হাসপাতালে ছিল এক্সরে মেশিনসহ বিভিন্ন যন্ত্রপাতি। বিভিন্ন সরঞ্জামাদি রাতের অন্ধকারে তার লোকজনদের দিয়ে তার মালিকানাধীন ক্লিনিকে নিয়ে যান। চোখে-মুখে রাজ্যের ক্ষোভ নিয়ে স্থানীয় ব্যবসায়ী ফজলুল হক বলেন, ‘এই হাসপাতালে বিছানা (শয্যা) নাই। এইটাকে অহন আর আমরা হাসপাতাল মনে করি না।
সকাল ১১ টায় মাঝে মধ্যে চিকিৎসক আসেন। দুপুর দেড়টার মধ্যে চলে যান। শুক্রবার আবার হাসপাতাল খুলা হয় না। এমন হাসপাতাল আমাদের দরকার নেই। ’
এসব বিষয়ে ময়মনসিংহ জেলা সিভিল সার্জন থেকে সাংবাদিকদের জানান, ‘স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ের অর্থায়নে সুদৃশ্য ভবন হলেও ওষুধ, শয্যা ও খাবারের কোনো বরাদ্দ নেই। তবে, প্রতিদিনই এখানে চিকিৎসক থাকেন। তবে আশার খবর এবার আমরা ওষুধ বাবদ ১ লাখ টাকা বরাদ্দ পেয়েছি। মানুষজন যাতে ন্যূনতম ওষুধ পান সেই চেষ্টা করছি।