
নিরাপদ ও স্বস্তিদায়ক ট্রেন যাত্রা ময়মনসিংহ অঞ্চলে ভোগান্তি ও ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। জরাজীর্ণ ট্র্যাক, মেয়াদোত্তীর্ণ ইঞ্জিন এবং নিয়মিত যান্ত্রিক ত্রুটির কারণে গত তিন মাসে এই রুটে অন্তত পাঁচটি ট্রেন লাইনচ্যুত হয়েছে এবং ২২টি বড় ধরনের ইঞ্জিন বিকল ও অগ্নিকাণ্ডের ঘটনা ঘটেছে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ-জামালপুর, মোহনগঞ্জ, জারিয়া, কিশোরগঞ্জ ও চট্টগ্রাম রুটে চলাচলকারী ৭০ বছর বা তারও বেশি পুরোনো রেললাইনগুলো এখন ঝুঁকিপূর্ণ। একই সঙ্গে চাহিদার তুলনায় অপর্যাপ্ত ও জরাজীর্ণ ইঞ্জিন দৈনন্দিন চলাচলে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে। কোনো ট্রেন লাইনচ্যুত বা ইঞ্জিন বিকল হলে যাত্রীদের দুর্ভোগে পড়তে হচ্ছে।
সর্বশেষ গত শুক্রবার সন্ধ্যা ৬টার দিকে জামালপুর থেকে ঢাকাগামী তিস্তা এক্সপ্রেস ময়মনসিংহ নগরীর নতুন বাজার এলাকায় পৌঁছালে ইঞ্জিন ত্রুটির কারণে থেমে যায়। এতে প্রায় আধা ঘণ্টা ঢাকা-জামালপুর রুটে ট্রেন চলাচল বন্ধ থাকে। পরে বিকল্প ইঞ্জিনের সাহায্যে ট্রেনটি স্টেশনে এনে লাইন সচল করা হয়।
এর আগে ২২ আগস্ট ময়মনসিংহের গফরগাঁওয়ে ‘দেওয়ানগঞ্জ কমিউটার’ ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়ে সোয়া দুই ঘণ্টা আটকে থাকে। তারও আগে ১৫ আগস্ট গফরগাঁওয়ে অগ্নিবীণা এক্সপ্রেসের ইঞ্জিন বিকল হয়। গত ৭ আগস্ট গফরগাঁও স্টেশনের কাছে ‘জামালপুর কমিউটার’ ট্রেনের পাঁচটি বগি লাইনচ্যুত হলে ঢাকার সঙ্গে ৭ ঘণ্টা যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন থাকে। এ ছাড়া গত ১৬ জুলাই তিন ঘণ্টার ব্যবধানে দুটি ট্রেনের লাইনচ্যুতি এবং ১০ জুন ব্রহ্মপুত্র এক্সপ্রেসের পাওয়ার কার ও উদ্ধারকারী ট্রেন উভয় লাইনচ্যুত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
ময়মনসিংহ রেলওয়ের পরিসংখ্যান অনুযায়ী, মে মাসে আটটি, এপ্রিলে ছয়টি এবং জুনে তিনটি ট্রেনের ইঞ্জিন বিকল হয়। এ ছাড়া গত ১৫ জুন গফরগাঁওয়ে ‘জামালপুর এক্সপ্রেস’-এর বগি থেকে ইঞ্জিন বিচ্ছিন্ন হয়ে যায় এবং একই দিন আঠারোবাড়িতে বিজয় এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনে আগুন লাগে।
ঢাকা-ময়মনসিংহ রেলপথের বিভিন্ন স্থানে স্লিপারের ফাস্টেনিং ক্লিপ ভাঙা বা গায়েব হয়ে গেছে। ক্ষয়প্রাপ্ত স্লিপার, দুর্বল বেস প্লেট এবং পর্যাপ্ত পাথরের (ব্যালাস্ট) অভাবে ট্র্যাকের স্থিতিশীলতা নষ্ট হচ্ছে। এই রুটে বর্তমানে ১৮ জোড়া ট্রেন চলাচল করলেও ইঞ্জিন ও কোচ সংকটের কারণে কয়েকটি মেইল ও লোকাল ট্রেন বন্ধ রাখা হয়েছে। পাশাপাশি অরক্ষিত রেলক্রসিং ও সিগন্যালিং ব্যবস্থার দুর্বলতা ঝুঁকি আরও বাড়িয়ে দিচ্ছে।
যাত্রীদের অভিযোগ, প্রতিবার দুর্ঘটনার পর তদন্ত কমিটি গঠন করা হলেও সুপারিশ বাস্তবায়নে কোনো কার্যকর পদক্ষেপ দেখা যায় না। অবিলম্বে জরাজীর্ণ ট্র্যাক সংস্কার, ভাঙা স্লিপার পরিবর্তন ও নতুন ইঞ্জিন সংযোজন করে এই রেলপথকে যাত্রীবান্ধব ও নিরাপদ করার দাবি তাদের।
ময়মনসিংহ স্টেশনের লোকোশেড পরিদর্শক শফিউল হাসান বলেন, অধিকাংশ ইঞ্জিন অনেক পুরোনো। পূর্ণাঙ্গ মেরামত ছাড়াই বাধ্য হয়ে এগুলোকে ট্রিপে পাঠাতে হচ্ছে, এর ফলে বারবার বিকল হচ্ছে।
রেলওয়ের জ্যেষ্ঠ সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী নাজমুল হাসান বলেন, এই রুটের অধিকাংশ ইঞ্জিন মেয়াদোত্তীর্ণ। নতুন ইঞ্জিন সংযোজনসহ শ্রীপুর থেকে ময়মনসিংহ হয়ে বিদ্যাগঞ্জ, গৌরীপুর, আঠারোবাড়ি, মোহনগঞ্জ ও জারিয়া পর্যন্ত রেলপথ দ্রুত সংস্কার করা জরুরি। বিশেষ করে পাথরের ঘাটতি মেটানো না গেলে দুর্ঘটনা রোধ করা কঠিন হবে।