
মামুনুর রশীদ মামুন | ময়মনসিংহ–
রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব হলো নাগরিকের জীবন, সম্পদ ও মর্যাদা সুরক্ষা নিশ্চিত করা। কিন্তু ময়মনসিংহ নগরীর সাম্প্রতিক ঘটনাগুলো দেখাচ্ছে—আইনের শাসন কি বাস্তবে কার্যকর, নাকি কেবল নীতিবাক্যে সীমাবদ্ধ? নগরীতে একই চক্রের বিরুদ্ধে ধারাবাহিকভাবে চাঁদাবাজি,সশস্ত্র হামলা,লুটপাট,ব্ল্যাকমেইল ও জোরপূর্বক স্বীকারোক্তি আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। অভিযুক্ত জাহাঙ্গীর ওরফে ‘সুন্দরী জাহাঙ্গীর’ ও তার সহযোগীরা ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান,সরকারি উন্নয়ন প্রকল্প এবং এক সংবাদকর্মীর ওপর হামলার ঘটনায় নামিয়ে আছেন। স্থানীয়রা অভিযোগ করেন—লিখিত ও মৌখিকভাবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে জানানো হলেও কার্যকর পদক্ষেপ নেই; নিরাপত্তাহীনতা ক্রমশ বেড়েই চলেছে। মাদ্রাসা থেকে সড়ক প্রকল্প: ধারাবাহিক অভিযোগ–
মাদ্রাসায় অনুপ্রবেশ ও চাঁদাবাজি: ২৩ জুন ২০২৫ রাতে পালপাড়ার মদিনাতুল কোরআন ওয়াস সুন্নাহ মাদ্রাসায় অভিযুক্তরা অনুপ্রবেশ করে ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা চাঁদা দাবি ও হুমকি দেন।
সরকারি প্রকল্পে বাধা ও মারধর: ৫ ডিসেম্বর ২০২৫ গভীর রাতে চলমান সড়ক নির্মাণ প্রকল্পে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কর্মকর্তাকে মারধরের অভিযোগ ওঠে। সংবাদকর্মীর ওপর সশস্ত্র হামলা: ২৭ ডিসেম্বর ২০২৫ নগরীর একটি ব্যবসা প্রতিষ্ঠানে দেশীয় অস্ত্রসহ হামলা,নগদ টাকা ও ইজিবাইক লুট এবং জিম্মি করে স্বাক্ষর আদায় ও ভিডিও ধারণের অভিযোগ। পরবর্তী সময়ে পুনরায় হামলার শিকার হওয়ার ঘটনা ঘটেছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ অনুযায়ী,পুলিশকে খবর দেওয়ার পরও প্রায় এক ঘণ্টা পরে মাত্র দু’জন সদস্য ঘটনাস্থলে পৌঁছান এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ব্যর্থ হন। আইনের শাসন ও প্রশাসনের দায়িত্ব:
ভুক্তভোগীরা অভিযোগ করলে আইনানুগ পদক্ষেপ নেওয়া রাষ্ট্রের মৌলিক দায়িত্ব। অভিযোগের পর তথ্য অধিকার আইনে পুলিশ, র্যাব-১৪ ও সিআইডিকে লিখিত অভিযোগ করা হয়েছে। র্যাব-১৪-এর অধিনায়ক নয়মুল হাসান বলেছেন, “অভিযোগের সত্যতা প্রমাণিত হলে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে।” সম্প্রতি বাহারুল আলম বিপিএম,বাংলাদেশ পুলিশের ইন্সপেক্টর জেনারেল মাঠ পর্যায়ের কর্মকর্তাদের সতর্ক করেছেন। তিনি বলেন: চাঁদাবাজি,ছিনতাই ও মাদক প্রতিরোধে দলমত নির্বিশেষে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে হবে। মহাসড়কে ডাকাতি প্রতিরোধে হাইওয়ে পুলিশ ও জেলা পুলিশের কার্যক্রম কঠোর করতে হবে। নীতিগত নির্দেশনা স্পষ্ট, কিন্তু মাঠে বাস্তবায়ন কতটা হচ্ছে—এটাই মূল প্রশ্ন। একই ব্যক্তি বা চক্র যদি ধারাবাহিকভাবে হামলার অভিযোগে অভিযুক্ত হয়,তাহলে আইন প্রয়োগের কৌশল,নজরদারি ও ভুক্তভোগীর নিরাপত্তা পুনর্মূল্যায়ন অপরিহার্য। রাজনৈতিক প্রভাব ও নিরপেক্ষ তদন্ত: স্থানীয় সূত্রের অভিযোগ অনুযায়ী,অভিযুক্তদের রাজনৈতিক প্রভাব রয়েছে। গণতান্ত্রিক দেশে রাজনৈতিক পরিচয় কখনোই অপরাধের ঢাল হতে পারে না। দলমত নির্বিশেষে সমান প্রয়োগ নিশ্চিত না হলে আইন “সবার জন্য সমান” কথাটি কেবল বাক্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে। অভিযোগ মানেই অপরাধ প্রমাণ নয়। স্বচ্ছ,সময়োপযোগী ও নথিভিত্তিক তদন্ত ছাড়া জনগণের আস্থা ফিরে আসবে না।
জাতীয় প্রেক্ষাপট: চাঁদাবাজি ও সশস্ত্র তাণ্ডব কেবল ময়মনসিংহের সমস্যা নয়; দেশের নানা প্রান্তে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান,সরকারি প্রকল্প ও ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে জড়িতদের কাছ থেকে অনানুষ্ঠানিক ‘টোল’ আদায়ের অভিযোগ শোনা যায়। এতে: বিনিয়োগ কমে,উন্নয়ন ব্যাহত হয়,
সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাবোধ ক্ষয়ে যায়।
আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির সামান্য অবনতি দ্রুত আস্থাহীনতায় রূপ নিলে সামাজিক ও অর্থনৈতিক ক্ষতি বহুগুণ বৃদ্ধি পায়। করণীয় পদক্ষেপ: ১.ঝুঁকিভিত্তিক নজরদারি ও তথ্য সমন্বয়: একই চক্রের বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকলে সমন্বিত তদন্ত টিম গঠন ও নিয়মিত মনিটরিং। ২.ভুক্তভোগী ও সাক্ষী সুরক্ষা: জিম্মি ও হুমকি প্রতিরোধে সুনির্দিষ্ট নিরাপত্তা। ৩.দ্রুত চার্জশিট ও বিচারের গতি: দীর্ঘসূত্রতা অপরাধীদের বার্তা দেয়। ৪.প্রশাসনিক জবাবদিহি: অভিযোগ উপেক্ষা বা বিলম্ব হলে প্রশাসনিক পর্যালোচনা। ৫.জনসম্পৃক্ততা ও হটলাইন কার্যকারিতা: অভিযোগ গ্রহণ,ট্র্যাকিং ও ফলো-আপে প্রযুক্তির ব্যবহার। সমাপ্তি: নাগরিক যদি নিরাপত্তাহীনতায় এলাকা ছাড়তে বাধ্য হন, তা কেবল ব্যক্তিগত ক্ষতি নয়—রাষ্ট্রের সামাজিক চুক্তিরও ভাঙন। দৃশ্যমান,নিরপেক্ষ ও দ্রুত পদক্ষেপ না হলে অভিযোগের পাহাড় কখনোই মুছে যাবে না। আইনের শাসন যদি সমানভাবে কার্যকর হয়—তবেই জনআস্থা ফিরবে; অন্যথায় চাঁদাবাজি,সশস্ত্র হামলা এবং হুমকির ঘটনায় জনগণ অনিরাপত্তায় উদ্বিগ্ন থাকবে। রাষ্ট্রের কঠোর,স্বচ্ছ ও নিরপেক্ষ পদক্ষেপ এখন সময়ের দাবি।