
অকাল বন্যা, অতিবৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে কিশোরগঞ্জের হাওর অঞ্চলে ফসলের ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হওয়া সত্ত্বেও সরকারিভাবে জেলার হাওর অঞ্চলকে ‘দুর্গত এলাকা’ হিসেবে ঘোষণা না করায় স্থানীয় কৃষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধিদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভ ও অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। তবে হাওরের কৃষক ও সুশীল সমাজের প্রতিনিধি দাবি তুলেছেন জরুরী ভিত্তিতে সরকার দুর্গত এলাকা হিসেবে ঘোষণা করার।
সাম্প্রতিক বন্যায় জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চলের ফসলি জমি ক্ষতিগ্রস্ত হলেও সরকারি তালিকায় কিশোরগঞ্জের নাম না থাকায় স্থানীয়রা একে চরম বৈষম্য হিসেবে অভিহিত করছেন। সম্প্রতি হাওরের ক্ষয়ক্ষতি নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর তথ্য উপদেষ্টার বক্তব্য সঠিক না বলেও স্থানীয় কৃষক ও সুশীল সমাজ জানিয়েছেন।
ক্ষয়ক্ষতি ও কৃষকদের দুর্দশার চিত্র
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের প্রাথমিক তথ্যমতে, কিশোরগঞ্জ জেলার মিঠামইন, ইটনা, অষ্টগ্রাম, তাড়াইল ও নিকলীসহ মোট ১৩টি উপজেলার কৃষক মারাত্মকভাবে ক্ষতির মুখে পড়েছেন। আকস্মিক বন্যায় বোরো ফসল তলিয়ে যাওয়ায় কৃষকেরা এখন সম্পূর্ণ দিশেহারা। স্থানীয়দের দাবি, অন্যান্য ক্ষতিগ্রস্ত জেলাকে সরকারিভাবে দুর্গত এলাকা ঘোষণা করা হলেও কিশোরগঞ্জকে এই তালিকায় অন্তর্ভুক্ত না করায় তারা প্রয়োজনীয় জরুরি সরকারি সহায়তা ও ক্ষতিপূরণ থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
তালিকা প্রণয়নে অনিয়ম ও বিলম্বের অভিযোগ
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, সরকারিভাবে দুর্গত এলাকা ঘোষণা না হওয়া এবং সহায়তা কার্যক্রম ঝুলে থাকার পেছনে মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক জরিপের ত্রুটি ও গাফিলতি অন্যতম কারণ। স্থানীয়দের অভিযোগসমূহ মূলত দুটি বিষয় সামনে এনেছেন।
মাঠ পর্যায়ের প্রাথমিক জরিপ থেকে বহু প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত প্রান্তিক কৃষকের নাম বাদ পড়েছে বলে তীব্র ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন ভুক্তভোগীরা।
অনিয়ম এবং পরবর্তীতে তা যাচাই-বাছাইয়ের জটিলতার কারণে চূড়ান্ত ক্ষতিগ্রস্তদের তালিকা প্রস্তুত করতে দীর্ঘ বিলম্ব হচ্ছে, যা কৃষকদের অসন্তোষকে আরও বাড়িয়ে দিয়েছে।
হাওর উন্নয়ন ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক, বীর মুক্তিযোদ্ধা অ্যাডভোকেট ফরিদ উদ্দিন আহমেদ এই পরিস্থিতির তীব্র নিন্দা জানিয়ে বলেন
”হাওর অঞ্চল হলো দেশের অন্যতম প্রধান খাদ্যভাণ্ডার। এবারের বন্যায় ফসল হারিয়ে এই অঞ্চলের মানুষেরা আগামী দিনগুলোতে কী খেয়ে বাঁচবে, সেই চিন্তায় সবাই এখন দিশেহারা। এই মুহূর্তে নতুন করে কোনো বিকল্প ফসল রোপণ করাও সম্ভব নয়, কারণ পুরো অঞ্চলই এখন বর্ষার পানিতে রূপান্তরিত হচ্ছে।”
তিনি হাওরবাসীকে মানবিক বিপর্যয় থেকে রক্ষায় আগামী ১২ মাসের জন্য পর্যাপ্ত খাদ্য ও আর্থিক সাহায্য-সহযোগিতা নিশ্চিত করতে সরকারের প্রতি জোর দাবি জানান।
উদ্ভূত পরিস্থিতি মোকাবিলায় এবং হাওরের প্রান্তিক কৃষকদের বাঁচাতে দ্রুত নিচের পদক্ষেপগুলো নেওয়া জরুরি বলে মনে করছেন সমাজসেবক মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল ও।
দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা ও ত্রাণ মন্ত্রণালয় এবং কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের যৌথ উদ্যোগে হাওরাঞ্চলের সামগ্রিক ক্ষতির প্রকৃত মূল্যায়ন দ্রুততম সময়ের মধ্যে শেষ করতে হবে।
মাঠ পর্যায়ের সব ধরনের অনিয়ম ও পক্ষপাতিত্ব দূর করে প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের অন্তর্ভুক্ত করে অতি দ্রুত চূড়ান্ত তালিকা প্রস্তুত করতে হবে।
প্রকৃত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের চিহ্নিত করে সরাসরি ‘স্মার্ট কার্ড’ বা ডিজিটাল মাধ্যমে কোনো প্রকার মধ্যস্বত্বভোগী ছাড়াই দ্রুত ক্ষতিপূরণ ও খাদ্য সহায়তা পৌঁছে দিতে হবে।
হাওরাঞ্চলে আগামী এক বছর কর্মসংস্থান ও খাদ্য নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে বিশেষ ভিজিএফ বা ওএমএস কার্যক্রমের মতো দীর্ঘমেয়াদি ও বিশেষ সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু করা প্রয়োজন।তিনি আরো বলেন বিশেষ করে হাওরের নদী খনন করতে হবে। নদী খনন করা হলেই পানি অকাল বন্যার হাত থেকে ফসল রক্ষা হবে।