
ময়মনসিংহের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার ইতিহাস দীর্ঘ ও সমৃদ্ধ। ব্রিটিশ আমলে ১৮৬৯ সালে নাসিরাবাদ পৌরসভার প্রথম সরকারি (অফিশিয়াল) চেয়ারম্যান ছিলেন মি. আর. পর্চা। ১৮৮৬ সালে চন্দ্রকান্ত ঘোষ প্রথম বেসরকারি (নন-অফিশিয়াল) চেয়ারম্যান হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। ১৯৪৮ সালে খানবাহাদুর গিয়াস উদ্দিন পাঠান নাসিরাবাদ পৌরসভার প্রথম মুসলিম চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন।
স্বাধীন বাংলাদেশে বিভিন্ন সময়ে অ্যাডভোকেট আমানউল্লাহ, আবদুল মোতালেব, দিলীপ কুমার দাস, বীর মুক্তিযোদ্ধা অধ্যক্ষ মতিউর রহমান, দেলোয়ার হোসেন খান দুলু এবং অ্যাডভোকেট মাহমুদ আল নূর তারেক পৌরসভার চেয়ারম্যান ও মেয়র হিসেবে দায়িত্ব পালন করে ময়মনসিংহের স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার বিকাশে অবদান রাখেন।
রাজনীতি সম্পর্কে একটি আলোচিত মন্তব্য হলো—
“আমাদের দেশে -দেশের চেয়ে রাজনৈতিক দল বড় হয়ে গেছে।
নিজের দল ভুল করলেও আমরা নীরব থাকি, আর অন্য দল ভালো কাজ করলেও সমালোচনায় মুখর হই। এই সংস্কৃতি থেকে বেরিয়ে এসে দেশ ও জনগণের স্বার্থকে সর্বাগ্রে স্থান দিতে হবে।”
এই বক্তব্য রাজনৈতিক দৃষ্টিভঙ্গি ও দলীয় বিভাজনের ঊর্ধ্বে জাতীয় স্বার্থকে গুরুত্ব দেওয়ার আহ্বান হিসেবে বিভিন্ন সময়ে আলোচিত হচ্ছে আজ।
ইকরামুল হক ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনের প্রথম নির্বাচিত মেয়র হিসেবে পরিচিত।
দীর্ঘ সময় ধরে স্থানীয় সরকার ব্যবস্থার সঙ্গে যুক্ত থেকে ময়মনসিংহ পৌরসভা ও পরবর্তীকালে সিটি কর্পোরেশনের উন্নয়নে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন।
অবকাঠামো উন্নয়ন, আধুনিক নগর ব্যবস্থাপনা এবং নাগরিক সেবার ডিজিটাল রূপান্তরের নানা উদ্যোগের কারণে তিনি ময়মনসিংহের স্থানীয় রাজনীতিতে একটি সুপরিচিত নাম।
ইকরামুল হক টিটু ১৯৭৬ সালের ১ আগস্ট ময়মনসিংহ জেলার একটি সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা মরহুম আলহাজ ফজলে হক এবং মাতা মরহুম মানোয়ারা খাতুন।
তিনি ময়মনসিংহ প্রি-ক্যাডেট, জিলা স্কুল ও মুকুল নিকেতন উচ্চ বিদ্যালয়ে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষা লাভ করেন।
পরবর্তীতে ময়মনসিংহের ঐতিহ্যবাহী আনন্দ মোহন কলেজ থেকে উচ্চ মাধ্যমিক এবং স্নাতক (সম্মান) ডিগ্রি অর্জন করেন।
ছাত্রজীবন থেকেই তিনি সামাজিক ও সাংগঠনিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে সম্পৃক্ত ছিলেন।
ইকরামুল হক টিটুর রাজনৈতিক জীবন মূলত স্থানীয় সরকারকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে।
২০১০-১১ সালের নির্বাচনে তিনি ময়মনসিংহ পৌরসভার মেয়র নির্বাচিত হন। পৌর মেয়র হিসেবে তিনি শহরের সড়ক, ড্রেনেজ ও নাগরিক সেবার উন্নয়নে বিভিন্ন প্রকল্প বাস্তবায়নের উদ্যোগ নেন।
২০১৮ সালে ময়মনসিংহ দেশের দ্বাদশ সিটি কর্পোরেশন হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হলে ২০১৯ সালের নির্বাচনে তিনি প্রথম নির্বাচিত মেয়র হন। পরবর্তীতে
২০২৪ সালের ৯ মার্চ অনুষ্ঠিত সিটি কর্পোরেশন নির্বাচনে টেবিল ঘড়ি প্রতীক নিয়ে পুনর্নির্বাচিত হোন।
মেয়র হিসেবে তাঁর সময়ে ময়মনসিংহ নগরের অবকাঠামোগত উন্নয়নে একাধিক প্রকল্প গ্রহণ ও বাস্তবায়ন করা হয়।
শহরের বিভিন্ন ওয়ার্ডে কাঁচা ও জরাজীর্ণ সড়ককে আরসিসি ও বিটুমিনাস কার্পেটিংয়ের মাধ্যমে উন্নত সড়কে রূপান্তর করা হয়। যানজট নিরসনে বিভিন্ন প্রধান সড়ক ও গুরুত্বপূর্ণ মোড় প্রশস্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হয়।
দীর্ঘদিনের জলাবদ্ধতা নিরসনের লক্ষ্যে শত শত কিলোমিটার আরসিসি পাইপ ড্রেন ও বৃহৎ আকারের মেইন ড্রেন নির্মাণ করা হয়। পাশাপাশি শহরের প্রাকৃতিক খালসমূহ দখলমুক্ত করে পানি প্রবাহ সচল রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়।
নগরীর আলোকায়নের জন্য প্রায় ৪৯ কোটি টাকা ব্যয়ে আধুনিক এলইডি সড়কবাতি স্থাপন প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হয়, যার ফলে শহরের প্রধান সড়কগুলো রাতেও আলোকিত ও নিরাপদ হয়ে ওঠে।
শহরের যানবাহন ব্যবস্থাপনা উন্নয়নের লক্ষ্যে পাটগুদাম বাস টার্মিনাল স্থানান্তর করে শহরের বাইরে পৃথক আধুনিক বাস ও ট্রাক টার্মিনাল নির্মাণের জন্য উন্নয়ন প্রকল্প প্রস্তাব (ডিপিপি) প্রণয়নের উদ্যোগ নেওয়া হয়।
তাঁর নেতৃত্বে সিটি কর্পোরেশনে নাগরিক সেবাকে আরও সহজ ও আধুনিক করতে হোল্ডিং ট্যাক্স, ট্রেড লাইসেন্স এবং বিভিন্ন সনদপত্রের জন্য অনলাইন আবেদন ও ডিজিটাল ট্র্যাকিং ব্যবস্থা চালু করা হয়। ডিজিটাল সেবায় অগ্রগতির জন্য তাঁর নেতৃত্বাধীন সিটি কর্পোরেশন বিভাগীয় পর্যায়ে স্বীকৃতিও অর্জন করে।
২০২০-২১ সালের করোনা মহামারির সময় তিনি ত্রাণ বিতরণ, স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং নাগরিক সহায়তা কার্যক্রমে সক্রিয় ভূমিকা পালন করেন। একই সময়ে ময়মনসিংহ সিটি কর্পোরেশনে বিনামূল্যে টেলিমেডিসিন সেবা চালু করা হয়, যার মাধ্যমে নাগরিকরা ঘরে বসেই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহণের সুযোগ পান।
নগর পরিচ্ছন্ন রাখতে নৈশকালীন বর্জ্য অপসারণ ব্যবস্থা চালু করা হয় এবং ডাস্টবিন ব্যবস্থার আধুনিকায়ন করা হয়। একই সঙ্গে বর্জ্যকে জৈব সার ও অন্যান্য সম্পদে রূপান্তরের লক্ষ্যে টেকসই বর্জ্য ব্যবস্থাপনার পরিকল্পনা গ্রহণ করা হয়।
তাঁর সময়ে ঐতিহাসিক জয়নুল আবেদিন পার্ক, ব্রহ্মপুত্র নদের পাড়সহ বিভিন্ন উন্মুক্ত স্থান ও বিনোদন কেন্দ্রের সংস্কার ও সৌন্দর্যবর্ধনের উদ্যোগ নেওয়া হয়, যাতে নাগরিকদের জন্য উন্নত বিনোদন পরিবেশ নিশ্চিত করা যায়।
তাঁর মেয়াদকালের শেষ পর্যায়ে প্রায় ১ হাজার ৫৭৫ কোটি টাকার একটি বৃহৎ অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্প বাস্তবায়নের কার্যক্রম চলমান ছিল। এই প্রকল্পের আওতায় বিশেষ করে নবসংযুক্ত ওয়ার্ডগুলোর সড়ক, ড্রেনেজ ও অন্যান্য নাগরিক সুবিধা উন্নয়নের কাজ শুরু হয়।
জনপ্রতিনিধি হওয়ার পাশাপাশি ইকরামুল হক টিটু একজন ব্যবসায়ী হিসেবেও পরিচিত। তিনি ময়মনসিংহ জেলা চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির সভাপতি হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন এবং স্থানীয় ব্যবসা-বাণিজ্যের বিকাশে ভূমিকা রাখেন।
ইকরামুল হক টিটু স্থানীয় রাজনীতিতে সহজ-সরল আচরণ, নম্র ব্যক্তিত্ব এবং সাধারণ মানুষের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ যোগাযোগের জন্য পরিচিত বলে মানুষ মনে করেন। তাঁর মেয়াদকালে বাস্তবায়িত উন্নয়ন কর্মকাণ্ড যেমন প্রশংসিত হয়েছে, তেমনি বিভিন্ন সিদ্ধান্ত ও প্রকল্প নিয়ে সমালোচনাও হয়েছে।
ফলে তিনি ময়মনসিংহের সমসাময়িক স্থানীয় রাজনীতির অন্যতম আলোচিত ব্যক্তিত্ব হিসেবে বিবেচিত হন।