
স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তর (এলজিইডি) ময়মনসিংহের নির্বাহী প্রকৌশলীর কার্যালয়ে গড়ে ওঠা দুর্নীতির সিন্ডিকেট, ‘৩% কমিশন বাণিজ্য’ এবং প্রকল্প পরিদর্শনে জালিয়াতির ঘটনার নথিপত্র ফাঁসের প্রায় তিন মাস অতিক্রান্ত হলেও আজ পর্যন্ত কোনো কার্যকর বিভাগীয় তদন্ত বা নিরপেক্ষ পদক্ষেপ নেওয়া হয়নি। অনুসন্ধানী তথ্য ও অডিও প্রমাণ প্রকাশের পরও প্রশাসনিক স্তরে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা না নেওয়ায় জনমনে প্রশ্ন উঠেছে।
গত ৩০ এপ্রিল জাতীয় দৈনিক ‘আমার প্রাণের বাংলাদেশ’-এ “এলজিইডি ময়মনসিংহে বিল বাণিজ্যের অভিযোগ: কমিশন, সাইট অনিয়ম ও নীরবতার সংস্কৃতি—উচ্চ পর্যায়ের হস্তক্ষেপ দাবি” শীর্ষক একটি অনুসন্ধানী প্রতিবেদন প্রকাশিত হয়। ওই প্রতিবেদনে অডিও রেকর্ড, বিল সংক্রান্ত গোপন নথিপত্র ও ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের তথ্যের ভিত্তিতে কমিশন বাণিজ্যের চিত্র তুলে ধরা হয়। তবে দীর্ঘ সময় পার হলেও এ বিষয়ে দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ দেখা যায়নি। ৩% পার্সেন্টেজ ও প্রাতিষ্ঠানিক কমিশন বাণিজ্য: অনুসন্ধানে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, ময়মনসিংহ এলজিইডি কার্যালয়ে উন্নয়ন প্রকল্প ও মেরামতের বিল ছাড়ের ক্ষেত্রে ‘৩% পার্সেন্টেজ’ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। কোনো ঠিকাদার এই নিয়মে কমিশন দিতে অস্বীকৃতি জানালে তার ফাইল প্রশাসনিক জটিলতায় আটকে রাখা এবং অডিট অজুহাতে বিল ছাড় ঝুলিয়ে রাখার অভিযোগ করেন ভুক্তভোগীরা। তথ্যপ্রমাণে জানা যায়, তৎকালীন নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান রহমান রাসেল-এর নির্দেশে কার্যালয়ের তৎকালীন হিসাবরক্ষক শহিদুল ইসলাম বিল ছাড়ের আগে এই ‘৩% পার্সেন্টেজ’ নগদ আদায় করতেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে সংগৃহীত ওই অর্থ দপ্তরের নির্দিষ্ট নিয়ম অনুযায়ী বন্টিত হতো বলে সূত্রে প্রকাশ। ভুয়া সাইট পরিদর্শন ও নোয়া (NOA) জালিয়াতির অভিযোগ: প্রকল্প তদারকি ও কাজের মূল্যায়নের ক্ষেত্রে অনিয়মের অভিযোগ তুলে ঠিকাদাররা জানান: ভূতুড়ে সাইট পরিদর্শন: সরেজমিনে প্রকল্পে উপস্থিত না হয়ে কার্যালয়ে বসে ইতিবাচক পরিদর্শন প্রতিবেদন তৈরি করার অভিযোগ রয়েছে। উৎকোচের বিনিময়ে প্রতিবেদন: কাজের মান সন্তোষজনক হওয়া সত্ত্বেও নির্ধারিত উৎকোচ না দিলে নেতিবাচক প্রতিবেদন দিয়ে ঠিকাদারদের হয়রানি করার অভিযোগ পাওয়া গেছে। নোয়া ও চুক্তিপত্রে জালিয়াতি: নোটিফিকেশন অব অ্যাওয়ার্ড (NOA) প্রদান এবং চুক্তিপত্র সম্পাদনের প্রতিটি ধাপে অতিরিক্ত অর্থ দাবি করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। যন্ত্রপাতি ব্যবহারে বাধা: সরকারি রোলার ও অন্যান্য যন্ত্রপাতি ব্যবহারে নির্ধারিত ফির বাইরে অতিরিক্ত অর্থ না দিলে যন্ত্রপাতি পেতে বিলম্ব সৃষ্টি করা হয়। দায় এড়ানোর বাহানা ও সাবেক কর্মকর্তার বক্তব্য: প্রতিবেদন প্রকাশের পর প্রায় দুই মাস কর্মস্থলে বহাল থাকলেও কোনো তদন্ত কমিটি গঠন বা ব্যবস্থা নেননি তৎকালীন অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবিএম নাজমুল করিম। গত ২৯ জুন তিনি অবসরে যান। এ বিষয়ে যোগাযোগ করা হলে সদ্য অবসরপ্রাপ্ত অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবিএম নাজমুল করিম দাবি করেন, “আমি এখন দায়িত্বে নেই।” ৩০ এপ্রিল থেকে ২৯ জুন পর্যন্ত দায়িত্বে থাকার পরও ব্যবস্থা না নেওয়ার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলেন, “বিষয়টি আমার নজরে আসেনি!” অনিয়ম ও দুর্নীতির বিষয়ে পুনরায় প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, “সংশ্লিষ্ট অফিসে এ ধরনের কোনো অনিয়ম ও দুর্নীতি হয় না।” এই বলেই তিনি ফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন এবং পরবর্তীতে আর কল রিসিভ করেননি। বদলি বা অবসরেই কি দায়মুক্তি?বঅভিযুক্ত সাবেক নির্বাহী প্রকৌশলী সালমান রহমান রাসেল বর্তমানে অন্য স্থানে বদলি হয়েছেন, এবং অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী এবিএম নাজমুল করিম এবং সাবেক হিসাব রক্ষক শহিদুল ইসলাম অবসরে গেছেন। স্থানীয় সচেতন মহলের প্রশ্ন, কর্মকর্তারা বদলি বা অবসরে গেলে কি অনিয়মের দায় থেকে মুক্ত হয়ে যাবেন? সরকারি অর্থ ও ক্ষমতার অপব্যবহারের অভিযোগের সুষ্ঠু তদন্ত ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ দাবি করেছেন তারা। এদিকে, গত ১৬ জুলাই নতুন নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেছেন হুমায়ুন কবির। ময়মনসিংহ কার্যালয়ে নতুন যোগদান করায় পূর্বের অভিযোগ ও নথিপত্র সম্পর্কে তিনি তাৎক্ষণিক ভাবে বিস্তারিত অবগতির কথা জানাননি। তবে এলজিইডির তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (SE) নাঈমা নাজনীন নাজ, এ প্রতিবেদক-কে জানিয়েছেন, তিনি পুরো বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখবেন। জিম্মি ঠিকাদার ও দুদকের হস্তক্ষেপ দাবি: কার্যালয়ের কিছু কর্মকর্তা-কর্মচারী ও ভুক্তভোগী ঠিকাদারদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে সেখানে প্রশাসনিক চাপ ও হয়রানির সংস্কৃতি চলে আসছে। অনিয়মের প্রতিবাদ করলে লাইসেন্স বাতিল বা বিল আটকে দেওয়ার ভয় দেখানো হতো। বিশেষজ্ঞ ও সচেতন নাগরিকদের মতে, উন্নয়ন তহবিলের অর্থ এভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হলে অবকাঠামোগত উন্নয়ন ব্যাহত হয়। কেবল বদলি বা অবসরের মাধ্যমে দায় এড়ানোর সুযোগ না রেখে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে একটি নিরপেক্ষ তদন্ত কমিটি গঠন করে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গুলোর স্বচ্ছ তদন্ত ও আইনি পদক্ষেপ নিশ্চিত করা প্রয়োজন।