
বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে নিজেকে অন্যতম ‘সমন্বয়ক’ ও ‘জুলাইযোদ্ধা’ হিসেবে দাবি করা এএনএম আয়াস আসলে কোনো সাধারণ শিক্ষার্থী নন। তাঁর প্রকৃত নাম মোহাম্মদ আল উজ্জল আহমেদ। তিনি মূলত একজন ভুয়া চিকিৎসক, যাঁর বিরুদ্ধে ভুয়া পরিচয়ে অস্ত্রোপচার করে রোগী হত্যার গুরুতর অভিযোগ রয়েছে। খোঁজ নিয়ে ও প্রাপ্ত নথিপত্র বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, নিজের দাগী অতীত ও হত্যা মামলা থেকে বাঁচতেই জালিয়াতির মাধ্যমে নাম ও বয়স পরিবর্তন করে অত্যন্ত সুকৌশলে তিনি ছাত্র আন্দোলনে অনুপ্রবেশ করেছেন।
সম্প্রতি ফারহানা শান্তা নামের এক নারীর সঙ্গে হাতাহাতির একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে এই আয়াস আলোচনায় আসেন। এরপরই বেরিয়ে আসতে শুরু করে তাঁর অন্ধকার অতীত। তাঁর ভুয়া চিকিৎসক হিসেবে কারাবরণের রেকর্ড, প্রতারণা ও জালিয়াতির একাধিক নথি এখন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ঘুরছে, যা সাধারণ শিক্ষার্থী ও আন্দোলনের সংগঠকদের মধ্যে তীব্র ক্ষোভের জন্ম দিয়েছে।
একাধিক সূত্র ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া জাতীয় পরিচয়পত্রের (এনআইডি) কপি থেকে জানা যায়, তাঁর আসল নাম মোহাম্মদ আল উজ্জল আহমেদ। তাঁর বাবার নাম মোস্তফা কামাল এবং মায়ের নাম খোরশেদা খাতুন। এনআইডিতে তাঁর জন্মতারিখ ১৮ নভেম্বর ১৯৯৮ এবং ঠিকানা দেওয়া রয়েছে ময়মনসিংহের বাঘমারায়।
অথচ বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনে তিনি পরিচিতি পেয়েছেন ‘এএনএম আয়াস’ নামে। অনলাইনে ছড়িয়ে পড়া তাঁর একটি জন্মনিবন্ধন সনদে দেখা যায়, সেখানে তিনি নাম দিয়েছেন ‘আল নুর মোহাম্মদ আয়াস’। পিতা-মাতার নাম ঠিক রাখলেও, নিজের জন্মসাল ১৯৯৮-এর পরিবর্তে ২০০৫ সাল দেখিয়েছেন। অর্থাৎ, জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে বয়স ৭ বছর কমিয়ে ২১ বছর বয়সী যুবক থেকে নিজেকে ১৪-১৫ বছরের ‘কিশোর ছাত্র’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তিনি।
নাম-বয়স জালিয়াতির চেয়েও ভয়ংকর তথ্য মিলেছে তাঁর অতীত অপরাধের রেকর্ডে। ফাঁস হওয়া ময়মনসিংহের কেন্দ্রীয় কারাগারের একটি প্রিজনারস কার্ড (পিসি কার্ড) থেকে জানা যায়, উজ্জল একসময় ময়মনসিংহে ভুয়া চিকিৎসক সেজে প্রতারণা করতেন।
অভিযোগ রয়েছে, নিজেকে সার্জন দাবি করে এক রোগীর অস্ত্রোপচার করতে গিয়ে তিনি ওই রোগীকে মেরে ফেলেন। এই রোগী হত্যার ঘটনায় গ্রেপ্তার হয়ে তিনি দীর্ঘদিন কারাবরণও করেন। ছড়িয়ে পড়া পিসি কার্ডটিতে হাজতি নম্বর ‘৩০৪০৭/২২’ হিসেবে আল উজ্জল আহমেদের নাম ও ছবি স্পষ্টভাবে দেখা গেছে। জেলখানার ওই নথিতে তাঁর অপরাধের বিবরণও উল্লেখ রয়েছে।
উজ্জল ওরফে আয়াসের প্রতারণার জাল শুধু ভুয়া চিকিৎসাতেই সীমাবদ্ধ ছিল না। ইমতিয়াজ নাদভী নামের এক ব্যক্তি সম্প্রতি ফেসবুকে বিস্তারিত তথ্য তুলে ধরে অভিযোগ করেন, উজ্জল ময়মনসিংহে একটি ভবন ভাড়া নিয়ে ক্লিনিক পরিচালনা করতেন। কিন্তু সেখানে প্রায় ১৬-১৭ লাখ টাকার ভাড়া বকেয়া রেখে তিনি রাতের আঁধারে পালিয়ে যান।
শুধু তাই নয়, ওই পোস্টে আরও দাবি করা হয়েছে, নিজেকে ক্যানসার আক্রান্ত রোগী সাজিয়ে মানুষের আবেগ নিয়ে খেলেছেন উজ্জল। চিকিৎসার নাম করে বিভিন্ন ব্যক্তির কাছ থেকে তিনি মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন এবং একপর্যায়ে আত্মগোপনে চলে যান।